কর্মীর অধিকার৪ মিনিটে পড়ুন
অসুস্থতার ছুটির আবেদন ও মেডিকেল সার্টিফিকেট: নিয়ম আর নমুনা
অসুস্থ হলে অফিসকে কখন কীভাবে জানাবেন, শ্রম আইনে অসুস্থতার ছুটি কত দিন, কখন চিকিৎসকের সনদ লাগে, ছুটি শেষ হয়ে গেলে কী হয়, আর আবেদনের নমুনা।

অসুস্থ শরীরে অফিসে যাওয়া নিজের জন্যও ক্ষতিকর, সহকর্মীদের জন্যও। তবু অনেকে যান, কারণ ভয় থাকে বেতন কাটা যাবে বা ঊর্ধ্বতন অসন্তুষ্ট হবেন। অসুস্থতার ছুটি কর্মীর অধিকার। নিয়মগুলো জানা থাকলে আর ঠিকভাবে জানালে সেই অধিকার ব্যবহার করা সহজ হয়।
শ্রম আইনে অসুস্থতার ছুটি
বাংলাদেশ শ্রম আইন যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য, সেখানে প্রত্যেক শ্রমিক বছরে ১৪ দিন পূর্ণ মজুরিসহ অসুস্থতার ছুটি পান (ধারা ১১৬)। মূল কথাগুলো:
- এই ছুটি পরের বছরে জমা হয় না।
- ছুটি মঞ্জুরের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরীক্ষা ও সনদ চাওয়া যায়, যেখানে বলা থাকে শ্রমিক অসুস্থ আর কত দিন বিশ্রাম দরকার।
- নৈমিত্তিক ছুটি (বছরে ১০ দিন) আলাদা; অসুস্থতার ছুটি শেষ হলে নৈমিত্তিক বা অর্জিত ছুটি থেকে সমন্বয়ের অনুরোধ করা যায়।
সব ধরনের ছুটির হিসাব পাবেন কোন ছুটি কত দিন লেখায়।
অনেক অফিস কর্মকর্তা শ্রম আইনের সংজ্ঞায় "শ্রমিক" না-ও হতে পারেন; তাদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ছুটির নীতিমালা প্রযোজ্য। সাধারণত সেখানেও বছরে নির্দিষ্ট দিনের অসুস্থতার ছুটি থাকে। নিয়োগপত্র আর নীতিমালা দেখে নিন।
অসুস্থ হলে প্রথম দিনেই যা করবেন
- অফিস শুরুর আগে বা যত দ্রুত সম্ভব ঊর্ধ্বতনকে জানান, ফোনে বা মেসেজে। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়ম থাকে কাজের শুরুর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জানাতে হবে।
- লিখিত রেকর্ড রাখুন। ফোন করলেও পরে একটা মেসেজ বা ইমেইল পাঠান। পরে "জানাননি" অভিযোগ উঠলে এটাই প্রমাণ।
- জরুরি কাজ কে দেখবে, সংক্ষেপে বলুন।
- চিকিৎসকের কাছে গেলে ব্যবস্থাপত্র রাখুন।
নমুনা ১: প্রথম দিনের মেসেজ
"আসসালামু আলাইকুম / শুভ সকাল। আমি গতরাত থেকে জ্বরে অসুস্থ, আজ অফিসে আসতে পারছি না। চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছি, কত দিন বিশ্রাম লাগবে জানিয়ে দেব। আজকের [জরুরি কাজ] [সহকর্মী]-কে বুঝিয়ে দিয়েছি।"
নমুনা ২: আনুষ্ঠানিক আবেদন
তারিখ: [দিন/মাস/বছর]
বরাবর [ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পদবি] [বিভাগ], [প্রতিষ্ঠান]
বিষয়: অসুস্থতাজনিত ছুটির আবেদন।
জনাব, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি গত [তারিখ] থেকে [রোগ, সংক্ষেপে বা "অসুস্থতা"]-এ আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আমার [সংখ্যা] দিন বিশ্রাম প্রয়োজন (ব্যবস্থাপত্র/চিকিৎসা সনদ সংযুক্ত)।
তাই [তারিখ] থেকে [তারিখ] পর্যন্ত মোট [সংখ্যা] দিনের অসুস্থতাজনিত ছুটি মঞ্জুর করার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিনীত [নাম] [পদবি], কর্মী নম্বর: [নম্বর]
নমুনা ৩: হাসপাতালে ভর্তি থাকলে
"আমি [তারিখ] থেকে [হাসপাতালের ধরন]-এ চিকিৎসাধীন ছিলাম এবং [তারিখ]-এ ছাড়পত্র পেয়েছি। চিকিৎসক আরও [সংখ্যা] দিন বাসায় বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন। ভর্তির সময় থেকে বিশ্রামের শেষ দিন পর্যন্ত, অর্থাৎ [তারিখ] থেকে [তারিখ], অসুস্থতাজনিত ছুটি এবং প্রয়োজনে অর্জিত ছুটি থেকে সমন্বয়ের অনুরোধ জানাচ্ছি। হাসপাতালের ছাড়পত্র ও চিকিৎসা সনদ সংযুক্ত।"
মেডিকেল সার্টিফিকেটে কী থাকা দরকার
চিকিৎসকের সনদ বা ব্যবস্থাপত্রে সাধারণত দেখা হয়:
- রোগীর নাম, যা অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে মেলে।
- পরীক্ষার তারিখ।
- কত দিন বিশ্রাম বা কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ।
- চিকিৎসকের নাম, নিবন্ধন নম্বর, স্বাক্ষর আর চেম্বার বা হাসপাতালের ঠিকানা।
রোগের বিস্তারিত বিবরণ অফিসকে জানানো বাধ্যতামূলক নয়। গোপনীয়তা বজায় রাখতে চাইলে চিকিৎসককে অনুরোধ করুন শুধু "কাজ থেকে বিশ্রাম প্রয়োজন" আর সময়কাল লিখে একটা সনদ দিতে।
ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট জমা দেওয়া গুরুতর অসদাচরণ, চাকরি হারানোর কারণ হতে পারে। কখনো করবেন না।
অসুস্থতার ছুটি শেষ হয়ে গেলে
- নৈমিত্তিক বা অর্জিত ছুটি থেকে সমন্বয়ের অনুরোধ করুন।
- দীর্ঘ অসুস্থতায় প্রতিষ্ঠানের নীতিমালায় বিশেষ ছুটি বা বিনা বেতনে ছুটির ব্যবস্থা আছে কি না জানুন।
- প্রতিষ্ঠানের গ্রুপ স্বাস্থ্যবিমা থাকলে চিকিৎসার খরচের দাবি করুন।
- চিকিৎসার খরচের জন্য অগ্রিম বেতনের প্রয়োজন হলে পড়ুন অগ্রিম বেতনের আবেদনপত্র।
কর্মক্ষেত্রে আঘাত বা দুর্ঘটনা
কাজ করতে গিয়ে আঘাত পেলে সেটা সাধারণ অসুস্থতার ছুটি নয়; শ্রম আইনে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য আলাদা ক্ষতিপূরণের বিধান আছে। ঘটনার পরপরই লিখিতভাবে জানান, চিকিৎসার সব কাগজ রাখুন, আর সম্ভব হলে সাক্ষীর নাম লিখে রাখুন।
অসুস্থতার কারণে বেতন কাটলে
শ্রম আইন প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠানে ১৪ দিনের মধ্যে চিকিৎসকের সনদসহ নেওয়া অসুস্থতার ছুটির জন্য মজুরি কাটা যায় না। কাটা হলে বেতনের স্লিপ আর ছুটির আবেদনের কপি নিয়ে এইচআরকে লিখিতভাবে জানান। সমাধান না হলে অভিযোগের পথ জানতে পড়ুন বেতন না দিলে কোথায় যাবেন।
আপনার প্রতিষ্ঠানে অসুস্থতার ছুটি পাওয়া যায়?
কাগজে নিয়ম থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে অসুস্থতার ছুটি নিতে গেলে চাপ দেওয়া হয়। চাকরি কেমন-এ কর্মীরা নাম প্রকাশ না করে জানান ছুটি আসলে পাওয়া যায় কি না। যোগ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি দেখে নিন, আর আপনার অভিজ্ঞতা জানাতে রিভিউ দিন।
সাধারণ প্রশ্ন
শ্রম আইনে বছরে কত দিন অসুস্থতার ছুটি পাওয়া যায়?
শ্রম আইন প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠানে বছরে ১৪ দিন, পূর্ণ মজুরিসহ। এই ছুটি পরের বছরে জমা হয় না।
অসুস্থতার ছুটির জন্য কি সবসময় মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগে?
আইনে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সনদ চাওয়ার সুযোগ আছে, আর অনেক প্রতিষ্ঠান এক-দুই দিনের বেশি ছুটিতে সনদ চায়। প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা দেখে নিন, আর ব্যবস্থাপত্র সবসময় সংরক্ষণ করুন।
মেডিকেল সার্টিফিকেটে কি রোগের নাম লিখতেই হবে?
বাধ্যতামূলক নয়। চিকিৎসক শুধু বিশ্রামের প্রয়োজন আর সময়কাল লিখে সনদ দিতে পারেন, যাতে আপনার গোপনীয়তা রক্ষা হয়।
যোগ দেওয়ার আগে খোঁজ নিন
যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, সেখানকার কর্মীরা কী বলছেন দেখে নিন — অথবা নিজের অভিজ্ঞতা লিখে অন্যকে সাহায্য করুন।
আরো পড়ুন

কর্মীর অধিকার৬ মিনিটে পড়ুন
অফিসে ছুটির আবেদনপত্র: নৈমিত্তিক, অসুস্থতা ও জরুরি ছুটির নমুনা
অফিসে ছুটি চাওয়ার আবেদন কীভাবে লিখবেন, কতদিন আগে জানাবেন, কোন ছুটি আইনে কত দিন পাওনা, আর ব্যবহার করার মতো পাঁচটি নমুনা।

কর্মীর অধিকার৪ মিনিটে পড়ুন
প্রবেশনকাল কত দিন? শিক্ষানবিশ কর্মীর অধিকার আর স্থায়ী হওয়ার নিয়ম
শ্রম আইনে প্রবেশনকাল কত দিন হতে পারে, কখন বাড়ানো যায়, প্রবেশন শেষে স্থায়ীকরণের চিঠি না দিলে কী হয়, আর প্রবেশনকালে বেতন, ছুটি ও চাকরি থেকে অব্যাহতির নিয়ম।

কর্মীর অধিকার৩ মিনিটে পড়ুন
কর্মঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ছুটির নিয়ম: দিনে কত ঘণ্টা কাজ আইনসম্মত
শ্রম আইনে দিনে ও সপ্তাহে সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা কাজ, বিরতির নিয়ম, সাপ্তাহিক ছুটি কয় দিন, ছুটির দিনে কাজ করালে কী পাওনা, আর অফিস কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।

কর্মীর অধিকার৩ মিনিটে পড়ুন
বেতন কবে দিতে হবে? মজুরি পরিশোধের আইনি সময়সীমা আর দেরি হলে করণীয়
শ্রম আইনে মজুরির মেয়াদ কত, মাস শেষের কত দিনের মধ্যে বেতন দিতে হয়, চাকরি শেষ হলে চূড়ান্ত পাওনা কত দিনে, বেতন থেকে কী কাটা যায়, আর দেরি হলে কী করবেন।