চাকরি কেমন
সব লেখা

কর্মীর অধিকার৩ মিনিটে পড়ুন

বেতন কবে দিতে হবে? মজুরি পরিশোধের আইনি সময়সীমা আর দেরি হলে করণীয়

শ্রম আইনে মজুরির মেয়াদ কত, মাস শেষের কত দিনের মধ্যে বেতন দিতে হয়, চাকরি শেষ হলে চূড়ান্ত পাওনা কত দিনে, বেতন থেকে কী কাটা যায়, আর দেরি হলে কী করবেন।

ক্যালেন্ডারে মাসের প্রথম সপ্তাহ চিহ্নিত, পাশে টাকার খাম আর ঘড়ি

মাস শেষ, কিন্তু বেতন আসেনি। এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, কখনো দুই-তিন মাস। বাংলাদেশে চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার একটি হলো বেতন সময়মতো না পাওয়া। চাকরি কেমন-এর রিভিউতে "প্রতি মাসে সময়মতো বেতন আসে কি না" প্রশ্নটা রাখা হয়েছে ঠিক এই কারণেই। শ্রম আইন বেতন পরিশোধের স্পষ্ট সময়সীমা দিয়েছে। জানা থাকলে নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলা সহজ হয়।

এই লেখা বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, আইনের সংজ্ঞায় "শ্রমিক" এমন কর্মীদের জন্য।

মজুরির মেয়াদ (ধারা ১২২)

নিয়োগকর্তা মজুরির মেয়াদ ঠিক করেন: দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক। তবে কোনো মজুরির মেয়াদ এক মাসের বেশি হতে পারে না। অর্থাৎ "তিন মাস পরপর বেতন" আইনসম্মত নয়।

বেতন দেওয়ার সময়সীমা (ধারা ১২৩)

মজুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সপ্তম কর্মদিবস পার হওয়ার আগেই মজুরি পরিশোধ করতে হবে। মাসিক বেতনের ক্ষেত্রে সহজ ভাষায়: মাস শেষের পর সাত কর্মদিবসের মধ্যে।

উদাহরণ: অক্টোবরের বেতন নভেম্বরের প্রথম সাত কর্মদিবসের মধ্যে পাওনা।

চাকরি শেষ হলে চূড়ান্ত পাওনা

অবসর, অব্যাহতি, ছাঁটাই, ডিসচার্জ, বরখাস্ত বা অন্য কোনো কারণে চাকরি শেষ হলে শ্রমিকের সব পাওনা মজুরি আইনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়; আইন অনুযায়ী এই সময়সীমা চাকরি অবসানের তারিখ থেকে ত্রিশ কর্মদিবস। চূড়ান্ত পাওনার মধ্যে কী কী থাকে, তার চেকলিস্ট পাবেন ইস্তফাপত্র ও নোটিশ পিরিয়ড লেখায়।

বেতন কীভাবে দিতে হয়

মজুরি নগদে, ব্যাংক হিসাবে বা আইনে অনুমোদিত অন্য মাধ্যমে দেওয়া যায়। ব্যাংক বা মোবাইল হিসাবে এলে সেটাই আপনার পরিশোধের প্রমাণ। নগদে পেলে বেতনের স্লিপ বা রেজিস্টারে সইয়ের সময় অঙ্ক মিলিয়ে নিন।

বেতন থেকে কী কাটা যায়

মজুরি থেকে কাটা যায় শুধু আইনে অনুমোদিত কারণে, যেমন:

  • আয়কর (উৎসে কর)।
  • প্রভিডেন্ট ফান্ডে কর্মীর অংশ।
  • অগ্রিম বা ঋণের কিস্তি, যা আগে নেওয়া হয়েছে।
  • অননুমোদিত অনুপস্থিতির দিনের মজুরি।
  • আইনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে জরিমানা, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে।

"কোম্পানির লোকসান হয়েছে, তাই সবার বেতন কাটা" বা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া কাটা আইনসম্মত নয়। বেতনের স্লিপে প্রতিটি কর্তন আলাদা লাইনে আছে কি না দেখুন। স্লিপ পড়ার নিয়ম: গ্রস আর নেট বেতন। অগ্রিম বেতন আর কিস্তি নিয়ে পড়ুন অগ্রিম বেতনের আবেদনপত্র।

বেতন দেরি হলে: ধাপে ধাপে

১. রেকর্ড রাখুন। নিয়োগপত্র, আগের মাসগুলোর বেতনের স্লিপ বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, হাজিরার প্রমাণ। কবে কত টাকা পাওনা, একটা তালিকা।

২. লিখিতভাবে জানতে চান। এইচআর বা ঊর্ধ্বতনকে ইমেইল: "[মাস]-এর বেতন এখনো পাইনি। কবে পরিশোধ করা হবে জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।" দলগতভাবে করলে প্রভাব বেশি, তবে ভদ্র ভাষায়।

৩. সরকারি সহায়তা। শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তরের হেল্পলাইনে অভিযোগ করা যায়, আর প্রয়োজনে শ্রম আদালতে মামলা। হেল্পলাইন নম্বর আর পুরো প্রক্রিয়া আছে বেতন না দিলে কোথায় যাবেন লেখায়।

৪. আইনি পরামর্শ। বড় অঙ্ক বা দীর্ঘ সময় বকেয়া থাকলে শ্রম আইনজীবীর পরামর্শ নিন। মামলা করার সময়সীমার নিয়ম আছে, তাই বেশি দেরি করবেন না।

অফিস কর্মকর্তাদের জন্য

আইনের সংজ্ঞায় শ্রমিক না হলে বেতনের সময় নিয়োগপত্র অনুযায়ী। তবু নিয়োগপত্রে বেতনের তারিখ লেখা থাকা উচিত, আর দেরি হলে একই ধাপে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া আর প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ নেওয়া যায়।

যোগ দেওয়ার আগেই জেনে নিন

ইন্টারভিউ বা অফারের সময় জিজ্ঞেস করুন: "বেতন মাসের কোন তারিখে আসে?" আর চাকরি কেমন-এ দেখুন প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মীদের কত শতাংশ বলেছেন বেতন সময়মতো আসে। অন্তত তিনজনের তথ্য জমা হলে এই হার দেখানো হয়, আর সময়মতো বেতন দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আলাদা তালিকা আছে র‍্যাংকিং পাতায়। আপনার অভিজ্ঞতা নাম প্রকাশ না করে জানান; এটাই পরের মানুষটাকে ভুল চাকরি থেকে বাঁচায়।

সাধারণ প্রশ্ন

শ্রম আইনে মাসিক বেতন কত দিনের মধ্যে দিতে হয়?

মজুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সপ্তম কর্মদিবস পার হওয়ার আগেই (ধারা ১২৩)। মাসিক বেতনে মাস শেষের পর সাত কর্মদিবসের মধ্যে।

চাকরি ছাড়ার পর চূড়ান্ত পাওনা কত দিনে পাওয়ার কথা?

আইন অনুযায়ী চাকরি অবসানের তারিখ থেকে ত্রিশ কর্মদিবসের মধ্যে সব পাওনা পরিশোধ করার কথা।

কোম্পানি কি লোকসানের অজুহাতে বেতন কাটতে পারে?

না। মজুরি থেকে শুধু আইনে অনুমোদিত কারণে কাটা যায়, যেমন আয়কর, প্রভিডেন্ট ফান্ড, অগ্রিমের কিস্তি বা অননুমোদিত অনুপস্থিতি।

শেয়ার করুন:ফেসবুকহোয়াটসঅ্যাপলিংকডইন

যোগ দেওয়ার আগে খোঁজ নিন

যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, সেখানকার কর্মীরা কী বলছেন দেখে নিন — অথবা নিজের অভিজ্ঞতা লিখে অন্যকে সাহায্য করুন।

আরো পড়ুন