কর্মীর অধিকার৩ মিনিটে পড়ুন
স্থায়ী, অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক না আউটসোর্সিং: কোন চাকরিতে কী অধিকার
শ্রম আইনে কর্মীর শ্রেণিগুলো কী কী, স্থায়ী আর অস্থায়ী চাকরির পার্থক্য, চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সিং কর্মীর অবস্থান, আর অফার নেওয়ার আগে কোন প্রশ্নগুলো করবেন।

দুজন একই অফিসে একই কাজ করছেন, কিন্তু একজন বছর শেষে বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড আর ছুটি পান, অন্যজন পান না। কারণ একজন "স্থায়ী", অন্যজন "চুক্তিভিত্তিক" বা "আউটসোর্সিং"। বাংলাদেশে চাকরির ধরন নিয়ে বিভ্রান্তি খুব বেশি, আর অনেকে নিয়োগপত্র না পড়েই যোগ দেন। কোন ধরনের চাকরিতে কী অধিকার, তা জানা থাকলে অফার তুলনা করা সহজ হয়।
শ্রম আইনে শ্রমিকের শ্রেণি (ধারা ৪)
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ৪ অনুযায়ী শ্রমিকেরা কাজের ধরন অনুযায়ী কয়েকটি শ্রেণিতে পড়েন:
- শিক্ষাধীন (অ্যাপ্রেন্টিস): প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে নিযুক্ত, প্রশিক্ষণকালে ভাতা পান।
- বদলি: স্থায়ী বা শিক্ষানবিশ কোনো শ্রমিকের অনুপস্থিতিতে তার জায়গায় কাজ করেন।
- সাময়িক (ক্যাজুয়াল): মাঝে মাঝে, সাময়িক প্রয়োজনে নিযুক্ত।
- অস্থায়ী (টেম্পোরারি): এমন কাজে নিযুক্ত যা অস্থায়ী প্রকৃতির এবং সীমিত সময়ে শেষ হবে।
- শিক্ষানবিশ (প্রবেশনার): স্থায়ী পদে নিযুক্ত, প্রবেশনকালে আছেন। নিয়ম জানুন প্রবেশনকাল কত দিন লেখায়।
- স্থায়ী: স্থায়ী পদে নিযুক্ত, অথবা প্রবেশনকাল সন্তোষজনকভাবে শেষ করেছেন।
- মৌসুমি: মৌসুমি কাজে, মৌসুম চলাকালীন।
মূল কথা: যে কাজ স্থায়ী প্রকৃতির, তাতে বছরের পর বছর "অস্থায়ী" বা "সাময়িক" রেখে দেওয়া আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মেলে না।
স্থায়ী চাকরির সুবিধা
শ্রম আইনের আওতায় স্থায়ী শ্রমিক সাধারণত বেশি সুরক্ষা পান:
- চাকরি শেষ করতে নিয়োগকর্তাকে নির্দিষ্ট নোটিশ দিতে হয় বা নোটিশের বদলে মজুরি দিতে হয়, আর নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ বা সার্ভিস বেনিফিট।
- ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম আর ক্ষতিপূরণ।
- নিয়মিত ছুটি আর অর্জিত ছুটি জমার সুবিধা।
- প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি আর উৎসব বোনাস।
চাকরি অবসানের নিয়ম আর পাওনা নিয়ে পড়ুন ছাঁটাই বা বরখাস্ত: আপনার অধিকার। ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ২০২৬ সালের সংশোধনে বদলেছে বলে জানা যায়; সঠিক অঙ্ক গেজেট দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন।
চুক্তিভিত্তিক চাকরি
অনেক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়: এক বছর, দুই বছর, বা প্রকল্পের মেয়াদ পর্যন্ত। এনজিও, ব্যাংকের কিছু পদ আর প্রকল্পভিত্তিক কাজে এটা বেশি।
চুক্তিতে যা অবশ্যই দেখবেন:
- মেয়াদ আর নবায়নের নিয়ম।
- বেতন আর সুবিধা: স্থায়ী কর্মীর মতো বোনাস, ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে কি না।
- মেয়াদের আগে চুক্তি শেষ করার শর্ত: কত দিনের নোটিশ, দুই পক্ষের জন্যই।
- মেয়াদ শেষে কী হবে: স্থায়ী হওয়ার সুযোগ, নাকি নতুন চুক্তি।
চুক্তিভিত্তিক হলেও কর্মী আইনের সংজ্ঞায় শ্রমিক হলে মজুরি সময়মতো পাওয়া, কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম আর মৌলিক ছুটির অধিকার থাকে।
আউটসোর্সিং বা ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ
নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ড্রাইভার, কল সেন্টারের কিছু পদ, এমনকি অফিস সহকারী পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নয়, একটি ঠিকাদার বা আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ পান। আপনি কাজ করেন এক জায়গায়, কিন্তু নিয়োগকর্তা অন্য প্রতিষ্ঠান।
জেনে নিন:
- আপনার নিয়োগপত্র কোন প্রতিষ্ঠান দিচ্ছে, বেতন কে দেয়।
- বেতন দেরি হলে কার কাছে অভিযোগ করবেন।
- আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান বদলালে আপনার চাকরি থাকবে কি না।
- ছুটি, ওভারটাইম আর বোনাসের নিয়ম কার নীতিমালা অনুযায়ী।
আইনে ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ নিয়েও বিধান আছে; বেতন না পেলে মূল প্রতিষ্ঠান আর ঠিকাদার দুজনকেই লিখিতভাবে জানান।
ডেইলি বা মাস্টাররোলে কাজ
দৈনিক মজুরিতে কাজ করা কর্মীরা প্রায়ই সবচেয়ে কম সুরক্ষা পান। তবু শ্রম আইনের আওতাভুক্ত হলে নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, কর্মঘণ্টা আর মজুরি পরিশোধের নিয়ম প্রযোজ্য। কাজের দিনগুলোর হিসাব আর মজুরির রেকর্ড নিজে রাখুন।
অফার তুলনা করার সময়
দুটো অফারের বেতন কাছাকাছি হলে চাকরির ধরন বড় পার্থক্য তৈরি করে। তুলনা করুন:
- মোট বেতনের সঙ্গে বছরে বোনাস কয়টা।
- প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রতিষ্ঠানের অংশ: প্রভিডেন্ট ফান্ড কী।
- চাকরির নিরাপত্তা: স্থায়ী, চুক্তি, নাকি আউটসোর্সিং।
- ছুটি আর স্বাস্থ্যবিমা।
অফার নেওয়ার আগে প্রশ্নের পুরো তালিকা: অফার নেওয়ার আগে যে প্রশ্নগুলো করবেন। আর চাকরি কেমন-এ রিভিউ লেখার সময় কর্মীরা জানান তারা পূর্ণকালীন, চুক্তিভিত্তিক না খণ্ডকালীন ছিলেন, তাই একই প্রতিষ্ঠানে কোন ধরনের কর্মীর অভিজ্ঞতা কেমন, তা বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠান খুঁজুন।
সাধারণ প্রশ্ন
স্থায়ী আর অস্থায়ী চাকরির মূল পার্থক্য কী?
স্থায়ী শ্রমিক স্থায়ী পদে কাজ করেন আর চাকরি অবসানে নোটিশ, ক্ষতিপূরণসহ বেশি সুরক্ষা পান। অস্থায়ী শ্রমিক নিযুক্ত হন এমন কাজে যা অস্থায়ী প্রকৃতির এবং সীমিত সময়ে শেষ হবে (ধারা ৪)।
আউটসোর্সিং কর্মীর বেতন না দিলে কার কাছে অভিযোগ করব?
আগে নিয়োগপত্র দেওয়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে, তারপর যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তাদেরও লিখিতভাবে জানান। সমাধান না হলে শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তরের হেল্পলাইন আর শ্রম আদালত।
যোগ দেওয়ার আগে খোঁজ নিন
যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, সেখানকার কর্মীরা কী বলছেন দেখে নিন — অথবা নিজের অভিজ্ঞতা লিখে অন্যকে সাহায্য করুন।
আরো পড়ুন

কর্মীর অধিকার৬ মিনিটে পড়ুন
অফিসে ছুটির আবেদনপত্র: নৈমিত্তিক, অসুস্থতা ও জরুরি ছুটির নমুনা
অফিসে ছুটি চাওয়ার আবেদন কীভাবে লিখবেন, কতদিন আগে জানাবেন, কোন ছুটি আইনে কত দিন পাওনা, আর ব্যবহার করার মতো পাঁচটি নমুনা।

কর্মীর অধিকার৪ মিনিটে পড়ুন
অসুস্থতার ছুটির আবেদন ও মেডিকেল সার্টিফিকেট: নিয়ম আর নমুনা
অসুস্থ হলে অফিসকে কখন কীভাবে জানাবেন, শ্রম আইনে অসুস্থতার ছুটি কত দিন, কখন চিকিৎসকের সনদ লাগে, ছুটি শেষ হয়ে গেলে কী হয়, আর আবেদনের নমুনা।

কর্মীর অধিকার৪ মিনিটে পড়ুন
প্রবেশনকাল কত দিন? শিক্ষানবিশ কর্মীর অধিকার আর স্থায়ী হওয়ার নিয়ম
শ্রম আইনে প্রবেশনকাল কত দিন হতে পারে, কখন বাড়ানো যায়, প্রবেশন শেষে স্থায়ীকরণের চিঠি না দিলে কী হয়, আর প্রবেশনকালে বেতন, ছুটি ও চাকরি থেকে অব্যাহতির নিয়ম।

কর্মীর অধিকার৩ মিনিটে পড়ুন
কর্মঘণ্টা ও সাপ্তাহিক ছুটির নিয়ম: দিনে কত ঘণ্টা কাজ আইনসম্মত
শ্রম আইনে দিনে ও সপ্তাহে সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা কাজ, বিরতির নিয়ম, সাপ্তাহিক ছুটি কয় দিন, ছুটির দিনে কাজ করালে কী পাওনা, আর অফিস কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কী প্রযোজ্য।