চাকরি কেমন
সব লেখা

কর্মীর অধিকার৩ মিনিটে পড়ুন

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি: অভিযোগ কোথায়, কীভাবে করবেন

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি কী কী আচরণে পড়ে, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযোগ কমিটি কেমন হওয়ার কথা, প্রমাণ কীভাবে রাখবেন, প্রতিষ্ঠানের বাইরে কোথায় যাবেন, আর সহকর্মী হিসেবে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন।

অফিসের প্রেক্ষাপটে থামার সংকেত দেওয়া হাত আর অভিযোগ বাক্সের প্রতীক

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নিয়ে কথা বলা এখনো কঠিন। অনেকে চুপ থাকেন চাকরি হারানোর ভয়ে, লজ্জায়, বা কোথায় অভিযোগ করবেন জানেন না বলে। অথচ বাংলাদেশে এ বিষয়ে আইনি কাঠামো আছে, আর প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকার কথা। এই লেখা জানাবে কোন আচরণ হয়রানি, অভিযোগের পথ কী, আর কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন।

এটা সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। নির্দিষ্ট ঘটনায় একজন আইনজীবী বা নারী অধিকার সংগঠনের সাহায্য নিন।

কোন আচরণ যৌন হয়রানি

২০০৯ সালে বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগ কর্মক্ষেত্র আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি নির্দেশনা দেন, যেখানে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা দেওয়া আছে। সাধারণভাবে এর মধ্যে পড়ে:

  • অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ বা স্পর্শের চেষ্টা।
  • যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, রসিকতা, বা চেহারা নিয়ে অশালীন মন্তব্য।
  • অশ্লীল ছবি, ভিডিও বা মেসেজ পাঠানো বা দেখানো।
  • যৌন সুবিধার বিনিময়ে চাকরি, পদোন্নতি বা সুবিধার প্রস্তাব, বা না মানলে ক্ষতির হুমকি।
  • পিছু নেওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বারবার যোগাযোগ।
  • ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া বা অফিসের চ্যাটে একই আচরণ।

মূল প্রশ্ন হলো আচরণটা অনাকাঙ্ক্ষিত কি না। "মজা করছিলাম" কোনো অজুহাত নয়। পুরুষ কর্মীরাও হয়রানির শিকার হতে পারেন।

প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কমিটি

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে একটি অভিযোগ কমিটি থাকার কথা, যার মূল বৈশিষ্ট্য:

  • কমপক্ষে পাঁচ সদস্য, যাদের বেশিরভাগ নারী।
  • কমিটির প্রধান একজন নারী।
  • কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের বাইরের সদস্য থাকা, নিরপেক্ষতার জন্য।
  • অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা।
  • নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে সুপারিশ।

এ ছাড়া শ্রম আইনেও নারী শ্রমিকের প্রতি অশালীন বা অমর্যাদাকর আচরণ নিষিদ্ধ। আপনার প্রতিষ্ঠানে কমিটি আছে কি না, কারা সদস্য, এইচআর বিভাগে জিজ্ঞেস করুন। না থাকলে সেটাও একটা গুরুতর তথ্য।

অভিযোগের আগে: প্রমাণ রাখুন

  • লিখে রাখুন: প্রতিটি ঘটনার তারিখ, সময়, স্থান, কী বলা বা করা হয়েছে, কে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার পরপরই লিখলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।
  • ডিজিটাল প্রমাণ: মেসেজ, ইমেইল, ছবির স্ক্রিনশট, সময় আর প্রেরকের নাম দেখা যায় এমনভাবে। অফিসের ডিভাইস থেকে নিজের ব্যক্তিগত ডিভাইসে কপি রাখুন, তবে প্রতিষ্ঠানের গোপনীয় তথ্য নয়।
  • সাক্ষী: কেউ দেখে বা শুনে থাকলে তার নাম।
  • বিশ্বস্ত কাউকে জানান: পরিবার বা বন্ধু; পরে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগতে পারে যে আপনি তখনই জানিয়েছিলেন।

অভিযোগের পথ

১. প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কমিটি বা এইচআর: লিখিত অভিযোগ দিন, প্রাপ্তিস্বীকার নিন। অভিযুক্ত আপনার সরাসরি ঊর্ধ্বতন হলে তাকে এড়িয়ে কমিটি বা উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে যান।

২. প্রতিশোধ থেকে সুরক্ষা: অভিযোগের পর বদলি, পদাবনতি, বেতন কাটা বা হয়রানি বাড়লে সেটাও লিখে রাখুন আর কমিটিকে জানান।

৩. প্রতিষ্ঠানের বাইরে:

  • থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা, বিশেষ করে শারীরিক আক্রমণ বা হুমকির ক্ষেত্রে।
  • জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, তাৎক্ষণিক বিপদে।
  • নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি হেল্পলাইন ১০৯।
  • আইনি সহায়তা দেওয়া নারী অধিকার সংগঠন আর জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার হেল্পলাইন।
  • শ্রম আইনের আওতায় পড়লে শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তর।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশের আগে ভাবুন

অনেকে অভিযোগ প্রকাশ্যে লেখেন, কারণ প্রতিষ্ঠানে বিচার পাননি। আপনার অভিজ্ঞতা বলার অধিকার আছে, তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম প্রকাশ মানহানির মামলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আগে আইনি পরামর্শ নিন।

চাকরি কেমন-এ আপনি প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি নিয়ে রিভিউ দিতে পারেন, যেমন "অভিযোগ কমিটি কার্যকর নয়" বা "নারী কর্মীদের জন্য পরিবেশ নিরাপদ নয়", কিন্তু কোনো ব্যক্তির নাম ছাড়া। এটা আমাদের নীতি: রিভিউ প্রতিষ্ঠান নিয়ে, ব্যক্তি নিয়ে নয়। এতে আপনিও আইনি ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকেন, আর অন্যরা সতর্ক হতে পারেন। বিস্তারিত: কাজে লাগে এমন রিভিউ লিখুন।

সহকর্মী হিসেবে কীভাবে পাশে দাঁড়াবেন

  • বিশ্বাস করুন, বিচার করবেন না।
  • সাক্ষী হলে লিখে রাখুন আর প্রয়োজনে সাক্ষ্য দিন।
  • অভিযোগের পথ জানাতে সাহায্য করুন।
  • গুজব ছড়াবেন না; ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখুন।

নিরাপদ কর্মস্থল বাছাই

চাকরি কেমন-এ রিভিউর "কর্মপরিবেশ" রেটিং আর মন্তব্যে কর্মীরা জানান পরিবেশ কতটা নিরাপদ। নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি খুঁজে দেখুন। রাতের শিফটে কাজ করলে পড়ুন নারী কর্মীর রাতের শিফটের নিয়ম।

সাধারণ প্রশ্ন

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগ কোথায় করব?

প্রথমে প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কমিটি বা এইচআরে লিখিতভাবে। প্রতিষ্ঠানের বাইরে থানা, জরুরি বিপদে ৯৯৯, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ হেল্পলাইন ১০৯ আর আইনি সহায়তা সংস্থা।

অভিযোগ কমিটি কেমন হওয়ার কথা?

২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কমপক্ষে পাঁচ সদস্য, বেশিরভাগ নারী, প্রধান একজন নারী, আর প্রতিষ্ঠানের বাইরের সদস্যসহ। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার কথা।

চাকরি কেমন-এ রিভিউতে কি হয়রানিকারীর নাম লেখা যায়?

না। রিভিউ প্রতিষ্ঠান নিয়ে, কোনো ব্যক্তির নাম ছাড়া। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বা অভিযোগ কমিটি কার্যকর কি না, সেটা লিখতে পারেন।

শেয়ার করুন:ফেসবুকহোয়াটসঅ্যাপলিংকডইন

যোগ দেওয়ার আগে খোঁজ নিন

যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, সেখানকার কর্মীরা কী বলছেন দেখে নিন — অথবা নিজের অভিজ্ঞতা লিখে অন্যকে সাহায্য করুন।

আরো পড়ুন