চাকরি কেমন
সব লেখা

কর্মীর অধিকার৩ মিনিটে পড়ুন

সার্ভিস বই ও পরিচয়পত্র: কেন পাওয়া আপনার অধিকার, কী থাকে, না দিলে কী করবেন

শ্রম আইনে নিয়োগপত্র, ছবিসহ পরিচয়পত্র আর সার্ভিস বই কেন বাধ্যতামূলক, সার্ভিস বইয়ে কী লেখা থাকে, চাকরি বদলালে কী হয়, আর এই কাগজগুলো কীভাবে আপনাকে রক্ষা করে।

ছবিসহ কর্মী পরিচয়পত্র আর খোলা সার্ভিস বই, পাতায় চাকরির বিবরণ লেখা

চাকরির কাগজপত্র নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি, যতক্ষণ না কোনো সমস্যা হয়। বেতন আটকে গেল, হঠাৎ চাকরি চলে গেল, বা দুর্ঘটনায় আহত হলেন; তখন প্রথম প্রশ্ন আসে, "আপনি যে এখানে কাজ করতেন, তার প্রমাণ কী?" শ্রম আইন এই কারণেই নিয়োগকর্তার জন্য কয়েকটি কাগজ দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে: নিয়োগপত্র, ছবিসহ পরিচয়পত্র আর সার্ভিস বই।

এই লেখা বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, আইনের সংজ্ঞায় "শ্রমিক" এমন কর্মীদের জন্য।

নিয়োগপত্র আর পরিচয়পত্র (ধারা ৫)

ধারা ৫ অনুযায়ী কোনো মালিক নিয়োগপত্র না দিয়ে কোনো শ্রমিককে নিয়োগ করতে পারেন না, আর প্রত্যেক নিয়োজিত শ্রমিককে ছবিসহ পরিচয়পত্র দিতে হয়। নিয়োগপত্রে কী থাকা জরুরি, তার তালিকা আছে নিয়োগপত্র ছাড়া চাকরি নয় লেখায়।

পরিচয়পত্রে সাধারণত থাকে: নাম, ছবি, পদবি, বিভাগ, কর্মী নম্বর, প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা, যোগদানের তারিখ।

পরিচয়পত্র কেন জরুরি:

  • কর্মস্থলে প্রবেশ আর নিরাপত্তা।
  • দুর্ঘটনা বা বিপদে আপনার কর্মস্থল শনাক্ত করা।
  • চাকরির প্রমাণ, বিশেষ করে যেখানে বেতন নগদে দেওয়া হয়।

সার্ভিস বই (ধারা ৬)

ধারা ৬ অনুযায়ী মালিক প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য একটি সার্ভিস বই রাখবেন। শিক্ষাধীন শ্রমিকের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়। সার্ভিস বই হলো শ্রমিকের চাকরিজীবনের লিখিত ইতিহাস।

সার্ভিস বইয়ে সাধারণত থাকে:

  • শ্রমিকের নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা আর ছবি।
  • বর্তমান প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা।
  • চাকরির শুরুর তারিখ।
  • পদবি, মজুরি আর তার পরিবর্তন।
  • ছুটির হিসাব।
  • আচরণ সম্পর্কে মন্তব্য।
  • চাকরি শেষের তারিখ আর কারণ।

সার্ভিস বই কার খরচে তৈরি হবে, কার কাছে থাকবে আর চাকরি বদলালে কী হবে, সে বিষয়েও আইনে বিধান আছে। নতুন চাকরিতে যোগ দিলে আগের সার্ভিস বই চাওয়া হতে পারে, যাতে চাকরির ধারাবাহিকতা রেকর্ডে থাকে। চাকরি ছাড়ার সময় আপনার সার্ভিস বইয়ের হালনাগাদ অবস্থা আর একটা কপি চেয়ে নিন।

এই কাগজগুলো কীভাবে আপনাকে রক্ষা করে

  • বেতন বা পাওনা নিয়ে বিরোধে: কত দিন কাজ করেছেন, কত মজুরিতে, তার প্রমাণ।
  • ছুটির হিসাবে: অর্জিত ছুটি কত জমেছে।
  • চাকরি অবসানে: কত বছর চাকরি করেছেন, যার ওপর ক্ষতিপূরণ বা সার্ভিস বেনিফিট নির্ভর করে।
  • দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণে: কর্মস্থলে নিযুক্ত ছিলেন কি না।
  • নতুন চাকরিতে: অভিজ্ঞতার প্রমাণ। অভিজ্ঞতা সনদ নিয়ে পড়ুন অভিজ্ঞতা সনদ লেখার নিয়ম।

কাগজ না দিলে কী করবেন

  • ভদ্রভাবে লিখিতভাবে চান। "আমি [তারিখ] থেকে কর্মরত। আমার নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র এখনো পাইনি; অনুগ্রহ করে প্রদানের ব্যবস্থা করবেন।"
  • নিজের বিকল্প রেকর্ড রাখুন: বেতনের স্লিপ, ব্যাংক বা মোবাইল হিসাবে বেতন জমার রেকর্ড, হাজিরার কার্ডের ছবি, অফিসের ইমেইল, সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের ছবি (প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে)।
  • দলগতভাবে জানান। একসঙ্গে কয়েকজন চাইলে প্রভাব বেশি।
  • সরকারি সহায়তা: শ্রম পরিদর্শন অধিদপ্তর কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এসব কাগজ দেখে। অভিযোগের পথ: বেতন না দিলে কোথায় যাবেন।

অফিস কর্মীদের জন্য

ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তারা আইনের সংজ্ঞায় শ্রমিক না হলেও প্রায় সব প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগপত্র আর পরিচয়পত্র দেয়, আর মানবসম্পদ বিভাগ ব্যক্তিগত ফাইল রাখে। নিজের কাছে রাখুন: নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, স্থায়ীকরণ আর পদোন্নতির চিঠি, বেতন বৃদ্ধির চিঠি। চাকরি ছাড়ার সময় এগুলোই আপনার চাকরিজীবনের প্রমাণ।

একটা ছোট অভ্যাস

প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ চাকরির কাগজের ছবি তুলে একটা আলাদা ফোল্ডারে রাখুন, ফোনে আর ক্লাউডে। কাগজ হারালে বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও আপনার রেকর্ড থাকবে।

আপনার প্রতিষ্ঠান কাগজপত্র দেয়?

নিয়োগপত্র আর পরিচয়পত্র ঠিকমতো দেওয়া একটা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের সবচেয়ে সহজ লক্ষণ। চাকরি কেমন-এ কর্মীরা নাম প্রকাশ না করে জানান তারা লিখিত নিয়োগপত্র পেয়েছেন কি না। যোগ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটি দেখে নিন, আর আপনার অভিজ্ঞতা জানান।

সাধারণ প্রশ্ন

সার্ভিস বই কী, কে রাখে?

সার্ভিস বই হলো শ্রমিকের চাকরিজীবনের লিখিত রেকর্ড: চাকরির শুরু, পদ, মজুরি, ছুটি, চাকরি শেষের কারণ। শ্রম আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী মালিক প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য এটা রাখেন।

নিয়োগপত্র আর পরিচয়পত্র দেওয়া কি বাধ্যতামূলক?

হ্যাঁ, শ্রম আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী নিয়োগপত্র না দিয়ে কোনো শ্রমিককে নিয়োগ করা যায় না, আর প্রত্যেক শ্রমিককে ছবিসহ পরিচয়পত্র দিতে হয়।

শেয়ার করুন:ফেসবুকহোয়াটসঅ্যাপলিংকডইন

যোগ দেওয়ার আগে খোঁজ নিন

যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, সেখানকার কর্মীরা কী বলছেন দেখে নিন — অথবা নিজের অভিজ্ঞতা লিখে অন্যকে সাহায্য করুন।

আরো পড়ুন